একজন হৃদয়ের ডাক্তার

রেজাউল করিম শামীম;

ডাক্তার তৃপ্তীশ চন্দ্র ঘোষ,কুমিল্লা শহরের একজন পরিচিত নাম।ডাক্তার হিসাবেতো বটেই।কবি,সাহিত্যিক,সংগঠক,কন্ঠ শিল্পী সর্বপরি একজন সজ্জন,মিশুক ব্যক্তি হিসাবেও সুপরিচিত।সব মিলিয়েই কুমিল্লার মানুষ না হয়েও এখন তিনি কুমিল্লার স্থায়ী বাসিন্দা হিসাবে সবার কাছে সমাদৃত।
সেই গত শতাব্দির ‘৯৪ সালের কথা।আমার বড় ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা বুলবুল ভাই হঠাৎ করেই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন।ভাবী,ছেলে-মেয়েদের নিয়ে বাপের বাড়িতে বেড়াতে গেছেন।আমিও অবিবাহিত।তখন আমার খুবই ঘনিষ্টজন ডাক্তার মোসলেহউদ্দিনকে খবর দিরে,তিনি চট জলদিই ওনাকে দেখেন।কোন রকম রাতটি পার হওয়ার পর পর,সকালেই ওনাকে সিডিপ্যাথ হাসপাতালে নিয়ে ভর্ত্তি করা হলো।হাসপাতালটি তখন নতুন।সেখানেই একজন অপরিচিত ডাক্তার, বিভিন্ন পরীক্ষা শেষে,ডাঃ মোসলেহউদ্দিনসহ পরামর্শ করে জানালেন, বুলবুল ভাইয়ের হার্ট এ্যটাক হয়েছে।তবে আপাতত শঙ্কামুক্ত। সেদিনই পরিচয় হলো ঐ নতুন ডাক্তার, তৃপ্তীশ চন্দ্রের সাথে। সেই থেকে নানা কারনে তিনি আমার হৃদয়ের আরো কাছাকাছি এলেন।হয়ে গেলেন আমার পছন্দের হৃদয়ের ডাক্তার।
বাদুরতলার রাজদেবী শিশু হাসপাতালের কাছে, পুকুরপাড়ের মনোরম স্থানে ওনার বর্তমান যে বাড়ি,যেখানে তিনি সপরিবারে থাকেন।তার জায়গাটি কেনার ক্ষেত্রে আমার কিছু সহযোগিতা ছিলো।আমার ঘনিষ্ট বন্ধু, প্রয়াত অসকার মালিক ছিলো ঐ জায়গাটির।তার অকাল মৃত্যুর পর জায়গাটি কেনেন সময়ও ডাঃ তৃপ্তীশ।সেসময়ও ওনার মহানুভবতার পরিচয় পেয়েছি।জায়গাটি কেনার সময় ক্রয়মূল্য চুড়ান্ত করা হয়েছিলো অসকারের বিধবা স্ত্রী ও তার দুই নাবালক ছেলের সাথে।তারপরও আমার অনুরোধে,বন্ধুর পরিবারের পিতৃহারা সন্তাদের জন্য আরো অতিরিক্ত কিছু বাড়তি মূল্য পরিশোধ করাতে হয় তৃপ্তীশকে।পরিমানটিও একেবারে নেহায়েত কম ছিলোনা।আজরের দিনে ক‘জনইবা এমনি উদারতা দেখাতে পারেন ?
ডাক্তর হিসাবে,তৃপ্তীশের এখন বেশ খ্যতি।তাঁর চেম্বারের সামনে রোগীর প্রচন্ড ভীড় দেখেই তা অনুমান করতে কষ্ট হয়না।এ্যপোয়েন্টম্যন্ট পাওয়াই যেখানে কষ্টসাধ্য।তারমাঝেও তিনি দরিদ্র,অসহায় রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা করেন।আমিও ক‘জন রোগী পাঠিয়ে বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছি ।
ডাক্তার তৃপ্তীশ, শুধু একজন চিকিৎসকই নন।লিখেনও চমৎকার। সাম্প্রতিক মরণব্যাধী করোনা নিয়ে সর্বত্রই চরম আতঙ্ক,উৎকন্ঠা, উৎবেগ,বিরাজমান।আর এসময়টিতেই ডা.তৃপ্তীশ,করোনার আদ্যপ্রান্ত এবং এথেকে মুক্তির পথ,জনসচেতনা ইত্যাদি বিষয়ের উপর বিস্তারিত লিখেছেন।সেসব লেখা নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে ‘করোনাকালে হৃদরোগ“ নামের একটি বই।তিনি যেহেতু হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ,সেহেতু সঙ্গত কারনেই লেখাগুলোর মধ্যে করোনর সাথে হৃদরোগ প্রাধান্য পেয়েছে।
ঢাকায় বই মেলায় সস্ত্রীক তৃপ্তীশের সাথে দেখা হয়েছে বটে। তবে অনেকদিন ডা.তৃপ্তীশের সাথে দেখা হচ্ছিলোনা।তাই এবার আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিলাম,দেখা করবো।হার্টের অবস্থা চেক করিয়ে নেবো।আর তাই সেদিন অনেক দিন পর কুমিল্লা গিয়ে সোজা ডা. তৃপ্তীশের চেম্বার।অসংখ্য অপেক্ষমান রোগী।ঢাকা ফিরতে হবে।ফলে বাধ্য হয়ে অন্যদের অসুবিধের কারণ ঘটিয়েই দেখা করার সুযোগ নিলাম।নয়া স্বাভাবিক পরিবেশ তৈরী করা হয়েছে ডাক্তারের কক্ষটি।সুন্দর সুরক্ষিত কাঁচঘেরা টেবিলের একপাশে ডাক্তার সাহেব বসেন। উল্টো দিকে একটি মাত্র চেয়ার। রোগী বসার জন্যে। আমার সাথে স্ত্রী মনি থাকায়, ডাক্তার সাহেব বেশ বিব্রত হওয়ার ভঙ্গিতেই বললেন,ভাবি এখানেতো বসার বাড়তি কোন চেয়ার নেই।যাক মাস্ক পড়েই আমরা কিছুক্ষন শরীর সংক্রান্ত কথাবার্তা সেরে নিলাম। পরক্ষেনেই ডাক্তার, যন্ত্র কানে লাগিয়ে বের হয়ে আসলেন কাঁচঘর ছেড়ে এবং যথানিয়মে আমার বুক-পিঠে যন্ত্র ঠেকিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা।
এপর্ব শেষে ডা. তৃপ্তীশ, তাঁর লেখা সর্বশেষ প্রকাশিত ‘করোন কালে হৃদরোগ‘ বইটি দিলেন।সেই সাথে নিজের লেখা কবিতার বই‘পাথরে ফোটাবো ফুল‘ এবং ওনার স্ত্রী. ডা.মল্লিকা বিশ্বাসের লেখা কবিতার বই‘ঝড়া পাতার সুখ দুঃখ‘ আনুষ্ঠানিক ভাবে তুলে দিলেন আমার হাতে।বলে রাখো ভালো যে,ডা. মল্লিকাও ভালো কবিতা লিখেন।ওনার লেখা প্রকাশিত বিইয়ের সংখ্য পাঁচটি।তিনিও ভালো সঙ্গীত শিল্পী এবং জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সন্মিলন,কুমিল্লা জেলা শাখার সভাপতি।ওনারা দু‘জনই একই হাসপাতালে কর্মরত বটে। তারপরও সময় এবং সময়ের বাস্তবতার কারনে শত ইচ্ছা থাকা সত্বেও বৌদির সঙ্গে এ যাত্রায় দেখা হলোনা।
ডাঃ তৃপ্তীশের করোনা কালে হৃদরোগ,নামের ৮০ পৃষ্টার বইটির নান্দনিক পচ্ছদ থেকে শুরু করে এর প্রতি পরতে পরতেই রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ সময়ের প্রয়োজনীয় সব লেখা।পুরো বই জুড়ে রয়েছে ২৮টি নিবন্ধ বিভিন্ন শিরোনামে।কোভিট-১৯ বা করোনা রোগের আতুড়ঘর থেকে শুরু করে এই মহামারি বিস্তার,প্রতিরোধ, হৃদরোগসহ অন্যান্য রোগের সাথে এর সম্পর্ক ও পরিনাম,এর সংক্রমন হারের ত্বত্ত ইত্যাদি আদ্যপ্রান্তের প্রয়োজনীয় অংশগুলো তুলে ধরা হয়েছে। আর এসব কঠিন বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে অত্যন্ত সহজসরল এবং সাবলিল ভাষায়।সকলের জন্যে বোধগম্য করে।এই বইটিসহ তৃপ্তীশের লেখা সমৃদ্ধ প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা মোট ১০টি।
ডা. তৃপ্তীশের পেশাগত পরিচিতির ফিরিস্তীটা একটু দীর্ঘই।‘১৯৯২ সালে সরকারী স্কলারশিপে তাসখন্দ থেকে কার্ডিওলজিতে পিএইচডি করেছেন,২০০৫ সালে আমেরিকান কলেজ অব কার্ডিওলজি এবং ২০০৭ সালে রয়েল কলেজ অব ফিজিশিয়ানস অব এডিনবার্গ থেকে ফেলোশিপ ডিগ্রী লাভ করেছেন।হৃদরোগ চিকিৎসা ও গবেষনায় বিশেষ অবদানের জন্য ইউরোপিয়ান সোসাইটি অব কার্ডিওলজি তাঁকে সন্মানজনক ফেলোশিপ প্রদান করেছে।তিনি কার্ডিওলজির প্রফেসার এবং কুমিল্লা ময়নামতি মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন।
কুমিল্লার লোক না হয়েও কুমিল্লাকে, কুমিল্লার মানুষকে ভালোবেসে ডা. যোবায়দা হান্নানের মতো যেক‘জন লোক কুমিল্লার জন্যে নিবেদিত হয়ে কাজ করেছেন,বলা যায় ডা. তৃপ্তীশ তাদেরই একজন।তাঁর প্রতিষ্ঠিত,হৃদরোগ প্রতিরোধ,চিকিৎসা,পুণর্বাসন এবং গবেষনা প্রতিষ্ঠান ‘হার্ট কেয়ার ফাউন্ডেশন‘এর জন্যেই কুমিল্লার মানুষ তাঁকে স্নরণ রাখবে বলেই আমার বিশ্বাস।কারন ঢাকার বাইরে গুরত্বপূর্ণ এমনি একটি কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান একমাত্র কুমিল্লাতেই রয়েছে।

আরো পড়ুন: